জন্মদিনে যেন ফিরে এসেছেন হ‌ুমায়ূন ফরীদি



তিনি থাকলে আজ তাঁর বয়স হতো ৬৭। তিনি নেই, তাও হয়ে গেল ৭টি বছর। অথচ কি জীবন্ত হ‌ুমায়ূন ফরীদি! আজ বুধবার সকাল থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তিনি আছেন। তিনি আছেন প্রিয়জনদের স্মৃতিতে, কথায়, ছবিতে। পুরোনো নাটকে, চলচ্চিত্রে। আজ সেসব শেয়ার করছেন অনুরাগীরা। জন্মদিনে তিনি যেন আবারও ফিরে এসেছেন। ফেসবুকে কিংবা আড্ডায় হ‌ুমায়ূন ফরীদির জয়ন্তী উপলক্ষে যখন এত কথা, স্মৃতিচারণা, এত আবেগ ঝরছে, তখন তিনি অনতিক্রমণীয় দূরত্বে। তিনি কী দেখছিলেন ছেড়ে যাওয়া সঙ্গী ও অনুরাগীরা কী গভীর শ্রদ্ধা আর নিখাদ ভালোবাসায় স্মরণে রেখেছেন তাঁকে? এ প্রশ্নের উত্তর কারও জানা নেই।

মঞ্চ, ছোট পর্দা, বড় পর্দায় সমান তালে দাপট দেখানোর মতো অভিনেতা বাংলাদেশে হাতে গোনা। অথচ এমন বিরল প্রতিভা নিয়ে অভিনয়ের সব মাধ্যমে দাপট দেখিয়েছেন হ‌ুমায়ূন ফরীদি। হ‌ুমায়ূন ফরীদির জন্মদিন আজ, ১৯৫২ সালের ২৯ মে ঢাকায় জন্মেছিলেন গুণী এই অভিনেতা। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে হুমায়ুন ফরীদি ছিলেন দ্বিতীয়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ছাত্র ফরীদি নাট্যচর্চার পুরোধা ব্যক্তিত্ব নাট্যকার সেলিম আল দীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন।


সকালে ফেসবুকে তারকা শিল্পী চঞ্চল চৌধুরী একটি সাদাকালো ছবি শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘শুভ জন্মদিন ফরীদি ভাই, হ‌ুমায়ূন ফরীদি একজনই।’ নাট্যকর চয়নিকা চৌধুরী একটি আঁকা ছবিসহ তিনটি ছবি শেয়ার দিয়ে লিখেছেন, ‘শুভ জন্মদিন হ‌ুমায়ূন ফরীদি, আপনার শূন্যতা অপূরণীয়। অনেক মিস করি আপনাকে, অনেক মিস করি আপনাদের সময়ের আন্তরিকতা, কাজের প্রতি ভালোবাসা, পরিচালকদের প্রতি শ্রদ্ধা, যেখানে থাকেন ভালো থাকেন।’ নির্মাতা মুকুল রহমান লিখেছেন, ‘আমার হিরো। শুভ জন্মদিন ফরীদি ভাই।’ মঞ্চকর্মী হাসান রেজাউল ২০১০ সালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এক্সপেরিমেন্টাল থিয়েটার হলে হুমায়ুন ফরীদির সঙ্গে স্মৃতিচারণা করেন। হ‌ুমায়ূন ফরীদি তাঁকে বই পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। রেজাউল লিখেছেন, ‘শ্রদ্ধা প্রিয় শিল্পী...বই পড়ার চেষ্টাটা করছি এবং অব্যাহত আছে।...কথাগুলো এখনো কানে বাজে।’ অস্ট্রেলিয়া থেকে আরেক নাট্যকর্মী শাহেদ আলী জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটি ভিডিও শেয়ার দিয়েছেন।


রাসেল আদিত্য লিখেছেন, ‘শুভ জন্মদিন অভিনয়ের জাদুকর!’ জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোটের সাধারণ সম্পাদক লিখেছেন ‘চিরকালের নবীন কিশোর সে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তমঞ্চ থেকে শুরু। পরবর্তীতে মঞ্চ, টেলিভিশন, বেতার, চলচ্চিত্র কোথায় দাপিয়ে বেড়াননি। গর্ব হয় মাঝে মাঝে আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। শুভ জন্মদিন বড় ভাই।’

গীতিকার মিজানুর রহমান জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে হ‌ুমায়ূন ফরীদির একটি মন্তব্য শেয়ার করেছেন, ‘তিন ধরনের শিল্পী আছে পৃথিবীতে। ভালো শিল্পী, বিপদগ্রস্ত শিল্পী আর অশিল্পী। বিপদগ্রস্ত শিল্পী সব সময় মনে করে, এই বুঝি পড়ে গেলাম!...এখনকার শিল্পীরা ত্রস্ত। দৌড়াচ্ছে। এই দৌড়টা বন্ধ করে হেঁটে যাও। টাকার পেছনে না ছুটে ভালো অভিনয় করো। টাকা এমনিই আসবে।’

চট্টগ্রামের সাকিব হাসান তাঁর ওয়ালের কভার ফটোতে হ‌ুমায়ূন ফরীদির সমাধির ছবি আপলোড করে লিখেছেন সংগৃহীত কবিতা, ‘চলে গেলে,আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে আমার না-থাকা জুড়ে।’ রেডিও জকি রাশেদ ইমাম লিখেছেন, ‘আপনার জন্মদিন আমার ভেতরে তিন দিনের একান্ত ব্যক্তিগত উৎসব, হে মান্যবর...।’

অনেকে শুভেচ্ছা জানিয়ে লিখেছেন হ‌ুমায়ূন ফরীদির চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে একটা যুগের অবসান হয়েছে। তাঁর দুর্দান্ত অভিনয়ে মুগ্ধ ও বিস্মিত হননি এমন মানুষ পাওয়া যাবে না। এমনও লিখেছেন কেউ কেউ, শুধু একবার তাঁর অভিনয় দেখার জন্যই টিভির সামনে বসে থেকেছি অনেক দিন।


অনেকের মন্তব্য ছিল এমন, মঞ্চ দিয়ে অভিনয় জগতে পা রাখলেও অভিনয়ের সব স্তরেই বিচরণ করেন এই গুণী অভিনেতা। টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে সমান তালে তিন দশকের পদার্পণ ছিল তাঁর। অভিনয়ের মাধ্যমে আমৃত্যু ছড়িয়েছেন জীবনের বর্ণিল আলো। অথচ তার ব্যক্তিজীবনটা ছিল পুরোটাই সাদামাটা।

জীবনকালে তাঁকে নিয়েও কম কথা হয়নি। ‘হ‌ুমায়ূন ফরীদির মতো শিল্পী যেকোনো দেশে জন্মাতে যুগ যুগ সময় লাগে, শতাধিক বছর লাগে। ও একজন ভার্সেটাইল শিল্পী। তাঁকে জিনিয়াসই বলা যায়।’ হুমায়ুন ফরীদিকে নিয়ে বলেছিলেন প্রয়াত নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী।

আরেক নাট্যজন রামেন্দু মজুমদার বলেছিলেন, ‘হ‌ুমায়ূন ফরীদি যখন প্রথম মঞ্চনাটকে অভিনয় করা শুরু করল, তখনই সবাইকে বলেছিলাম এই ছেলে মঞ্চ কাঁপাবে। অবশ্য ফরীদি কিন্তু মঞ্চের চেয়েও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল চলচ্চিত্রে। তার রসবোধ ছিল প্রখর। কোনো একটা সিরিয়াস মুহূর্তকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণচাঞ্চল্যে ভরিয়ে দিতে তাঁর তুলনা ছিল না।’ মঞ্চ, টিভি ও চলচ্চিত্রের শক্তিমান এই অভিনেতাকে নিয়ে সংস্কৃতিজগতের প্রায় সবার এমনটাই অভিমত। অভিনেতা হিসেবে তিনি যেমন শক্তিমান, মানুষ হিসেবেও ছিলেন অনন্য।

বর্ণাঢ্য অভিনয় জীবনে হ‌ুমায়ূন ফরীদি চলচ্চিত্র, টেলিভিশন ও মঞ্চে সমান দাপটের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। অর্জন করেছেন দেশ-বিদেশের লাখো-কোটি ভক্তের ভালোবাসা। দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত ও রোমান্টিক মানুষ হুমায়ুন ফরীদি আশির দশকের শুরুতে বেলি ফুলের মালা দিয়ে ফরিদপুরের মেয়ে মিনুকে বিয়ে করেন। তাঁর এ বিয়ে সে সময় সারা দেশে বেশ আলোচিত ছিল। সে সংসারে দেবযানী নামে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়। পরে হুমায়ুন ফরীদি সংসার শুরু করেন অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে। ২০০৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। এরপর থেকে একাকী জীবন যাপন করেছেন তিনি। তবে সবকিছুকে ছাপিয়ে হুমায়ুন ফরীদি তাঁর অভিনয় দিয়েই মুগ্ধ করে রেখেছিলেন অগুনতি দর্শক-সমালোচককে।

মঞ্চে দিয়ে শুরু করলেও হ‌ুমায়ূন ফরীদি মঞ্চের চেয়েও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন চলচ্চিত্রে
মঞ্চে দিয়ে শুরু করলেও হ‌ুমায়ূন ফরীদি মঞ্চের চেয়েও তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন চলচ্চিত্রে
১৯৭৬ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নাট্য উৎসব আয়োজনেরও প্রধান সংগঠক ছিলেন ফরীদি। এ উৎসবের মধ্য দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়ে অঙ্গনে তাঁর ব্যাপক পরিচিতি গড়ে ওঠে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে বাংলাদেশে একজন মেধাবী ও শক্তিমান নাট্যব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজের জাত চিনিয়েছিলেন তিনি। অসাধারণ অভিনয়ের মাধ্যমে যে আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন ফরীদি, তাঁর সেই উচ্চতায় এ দেশের খুব কম মানুষই পৌঁছাতে পেরেছেন।

বাংলাদেশ গ্রাম থিয়েটারের সদস্য হিসেবে তিনি গ্রাম থিয়েটারের চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রধান হিসেবে কাজ করেছেন। ঢাকা থিয়েটারের সদস্য হিসেবে শুধু ঢাকাতেই নয়, বাংলাদেশের বিভিন্ন মঞ্চে অভিনয় করে জনপ্রিয়তা অর্জনের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়কে গৌরবান্বিত করার ক্ষেত্রেও অসামান্য ভূমিকা পালন করেন তিনি।

হুমায়ুন ফরীদি মঞ্চ, টিভি ও সিনেমায় অভিনয় করে স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নির্মাণে সক্ষম হয়েছিলেন। ফরীদি তাঁর কয়েক দশকের কর্মময় জীবনে অসংখ্য বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করেছেন। ফরীদি অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে ‘শ্যামল ছায়া’, ‘জয়যাত্রা’, ‘আহা!’ , ‘হুলিয়া’, ‘একাত্তরের যীশু’, ‘দহন’, ‘সন্ত্রাস’, ‘ব্যাচেলর’ প্রভৃতি। উল্লেখযোগ্য টিভি নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘নীল নকশার সন্ধানে’ (১৯৮২), ‘দূরবীন দিয়ে দেখুন’ (১৯৮২), ‘ভাঙনের শব্দ শুনি’ (১৯৮৩), ‘ভবের হাট’ (২০০৭), ‘শৃঙ্খল’ (২০১০) প্রভৃতি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে সম্প্রচার হওয়া ধারাবাহিক ‘সংশপ্তক’ নাটকে ফরীদির অনবদ্য অভিনয়ের কল্যাণে ‘কান কাটা রমজান’ চরিত্রটি তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।


জন্মদিনে তাঁর কিছু কথা মনে পড়ছে। মৃত্যু বিষয়ে। একটি টিভি চ্যানেলে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মৃত্যু নিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘মৃত্যুর মতো এত স্নিগ্ধ, এত গভীর সুন্দর আর কিছু নেই । কারণ মৃত্যু অনিবার্য, তুমি যখন জন্মেছ, তখন মরতেই হবে। মৃত্যুর বিষয়টি মাথায় থাকলে কেউ পাপ করবে না। যেটা অনিবার্য, তাকে ভালোবাসাটায় শ্রেয়।’

তিনি এই অনুষ্ঠানে আরও বলেন, ‘মৃত্যুকে ভয় পাওয়া মূর্খতা। জ্ঞানীরা মৃত্যুকে ভয় পায় না। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করো। গ্রহণ করো, বরণ করে নাও। তাহলে দেখবে জীবন কত সুন্দর।’

তিনি ২০১২ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুকে বরণ করেন। কিন্তু দেহান্তর মানেই মানুষের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া নয়। তাঁর সৃষ্টি ও কর্ম মহাকালকে পরাজিত করে কালোত্তীর্ণ হয়ে ওঠে। আক্ষরিক অর্থে মৃত্যুকে জয় করার উপায় না থাকলেও এভাবেই মৃতুঞ্জয়ী হয়ে ওঠেন কেউ কেউ। আজ জন্মদিনে সে কথাই আবার প্রমাণিত হলো।

No comments

Powered by Blogger.